ইসলামী বিশ্বের বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি মৌলিক প্রশ্ন বারবার সামনে আসে—আমাদের ধর্মীয় জীবনের একমাত্র চালিকাশক্তি কী হওয়া উচিত? আল্লাহ তাআলা কি তাঁর দীনকে অসম্পূর্ণ রেখেছিলেন যে তা পূর্ণ করতে নবীর ইন্তেকালের দুই থেকে তিনশ বছর পর সংকলিত মানুষের সংগৃহীত বাণীর প্রয়োজন হবে?
আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব কেন পবিত্র কুরআনই আমাদের জন্য একমাত্র চূড়ান্ত মানদণ্ড হওয়া উচিত এবং কেন পরবর্তীকালে সংকলিত হাদিসশাস্ত্র নিয়ে অতি-মাতামাতি আমাদের মূল পথ থেকে বিচ্যুত করতে পারে।
১. কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা: আল্লাহর ঘোষণা
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে বারবার ঘোষণা করেছেন যে এই কিতাবটি পূর্ণাঙ্গ এবং এতে কোনো কিছুর অভাব রাখা হয়নি।
“আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নেয়ামত সম্পূর্ণ করলাম…” (সূরা আল-মায়েদাহ, আয়াত: ৩)
যদি ধর্ম ৩ হিজরি শতকে (যখন বুখারি বা মুসলিম সংকলিত হয়) পূর্ণতা পেত, তবে এই আয়াতটি নাযিলের কোনো যৌক্তিকতা থাকত না। এছাড়া সূরা আল-আন’আমের ৩৮ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: “আমি কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি।” অতএব, যে কিতাব স্বয়ংসম্পূর্ণ, সেখানে বাইরের কোনো উৎসের (হাদিস) ওপর নির্ভর করা কি আল্লাহর কালামের ওপর অনাস্থা প্রকাশ নয়?
২. হাদিস সংরক্ষণে রাসুলুল্লাহ (সাঃ)-এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা
অনেকে মনে করেন হাদিস সংরক্ষণ করা ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু ঐতিহাসিক সত্য হলো, রাসুল (সাঃ) নিজেই হাদিস লিখে রাখতে নিষেধ করেছিলেন।
সহিহ মুসলিমের (হাদিস নং ৭৩২০) একটি বর্ণনা অনুযায়ী, রাসুল (সাঃ) বলেছেন:
“আমার থেকে কুরআন ব্যতীত অন্য কিছু লিখো না। আর যে ব্যক্তি কুরআন ছাড়া অন্য কিছু লিখেছে, সে যেন তা মুছে ফেলে।”
এই নির্দেশটি অত্যন্ত পরিষ্কার। যদি হাদিস দ্বীনের দ্বিতীয় উৎস হতো, তবে রাসুল (সাঃ) সাহাবীদের তা মুখস্থ রাখার পাশাপাশি লিখে রাখার নির্দেশ দিতেন, যেমনটি তিনি কুরআনের ক্ষেত্রে করেছিলেন। এমনকি প্রথম চার খলিফার আমলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক হাদিস সংকলন হয়নি, বরং তারা কুরআনকেই একমাত্র সংবিধান হিসেবে মেনে চলেছেন।
৩. ঐতিহাসিক অসারতা: ৩০০ বছরের ব্যবধান
হাদিস শাস্ত্রের প্রধান গ্রন্থগুলো (সিহাহ সিত্তা) রাসুল (সাঃ)-এর ইন্তেকালের প্রায় ২০০ থেকে ৩০০ বছর পর সংকলিত। এই দীর্ঘ সময়ে তথ্যগুলো কেবল মৌখিকভাবে একজনের কাছ থেকে অন্যজনের কাছে পৌঁছেছে।
যৌক্তিক প্রশ্নসমূহ:
- মানুষের স্মৃতিশক্তি কি ত্রুটিমুক্ত? ২০০ বছরে একটি কথা দশজনের হাত ঘুরে পৌঁছালে তার মূল রূপ অক্ষুণ্ণ থাকা কি অসম্ভব নয়?
- ইমাম বুখারি (রহ.) ৬ লক্ষ হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন, যেখান থেকে মাত্র ৭-৯ হাজার হাদিস গ্রহণ করেছেন। অর্থাৎ, ৫ লক্ষ ৯০ হাজারের বেশি হাদিসই ছিল জাল বা ত্রুটিপূর্ণ। যেখানে জালের সংখ্যা সত্যের চেয়ে শতগুণ বেশি, সেখানে সেই উৎসকে ধর্মের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা কতটা নিরাপদ?
৪. কুরআন ও হাদিসের পারস্পরিক সংঘর্ষ
অনেক তথাকথিত ‘সহিহ’ হাদিস পাওয়া যায় যা কুরআনের সরাসরি বিরোধী।
- কুরআন বলে ব্যভিচারের শাস্তি চাবুক মারা (সূরা নূর), কিন্তু হাদিস বলে পাথর মেরে হত্যা করা (রজম)।
- কুরআন বলে ধর্মে কোনো জবরদস্তি নেই (সূরা বাকারা: ২৫৬), কিন্তু হাদিস বলে ধর্মত্যাগীকে হত্যা করো।
যখন আল্লাহর বাণী এবং মানুষের সংগৃহীত বাণীর মধ্যে সংঘর্ষ বাধে, তখন একজন মুমিনের কাছে কোনটি অগ্রগণ্য হওয়া উচিত? উত্তরটি সহজ—কুরআন। অথচ আজ আমরা হাদিসের দোহাই দিয়ে কুরআনের শিক্ষাকে আড়াল করছি।
৫. মনীষী ও চিন্তাবিদদের দৃষ্টিভঙ্গি
ইতিহাসের অনেক সাহসী চিন্তাবিদ এই ‘কুরআন-কেন্দ্রিক’ মতবাদকে সমর্থন করেছেন।
- ইব্রাহিম নাজ্জাম (মুতাজিলা পন্ডিত): তিনি মনে করতেন, একক ব্যক্তি থেকে বর্ণিত হাদিস (খবরে ওয়াহিদ) নিশ্চিত সত্য হতে পারে না।
- মিশরের বিখ্যাত আলেম ড. রশিদ রিদা: তিনি অনেক হাদিসকে ‘ইসরাঈলি বর্ণনা’ (অন্য ধর্ম থেকে আসা গল্প) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন এবং কুরআনকে একমাত্র সত্যের মানদণ্ড বলেছেন।
- সৈয়্যদ আহমদ খান: তাঁর মতে, হাদিসগুলো মূলত তৎকালীন সময়ের সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, যা চিরন্তন বিধান হতে পারে না।
৬. হাদিস কেন্দ্রিকতার কুফল: বিভক্তি ও মূর্খতা
আজ মুসলিম উম্মাহ হাজারো দলে বিভক্ত। এই বিভক্তির মূল কারণ কুরআন নয়, বরং হাদিসের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা এবং মাজহাবি গোঁড়ামি। কুরআন সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ডাক দেয় (“তোমরা সবাই আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে ধরো” – সূরা আল-ইমরান: ১০৩), আর হাদিসের সংজ্ঞাগত পার্থক্য আমাদের বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
কুরআনের গভীর বিজ্ঞানময় ও দার্শনিক আলোচনা বাদ দিয়ে হাদিসের চুলচেরা বিশ্লেষণ নিয়ে মেতে থাকা আধুনিক যুগে আমাদের পিছিয়ে দিচ্ছে। একে ‘মুর্খতা’ বলা অমূলক নয়, কারণ আমরা মূল উৎস (কুরআন) ছেড়ে শাখা-প্রশাখা (হাদিস) নিয়ে বিবাদে লিপ্ত।
উপসংহার
পরিশেষে, আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মূলে যেখানে কোনো সংশয় নেই। কুরআন আল্লাহর নূর, যা কিয়ামত পর্যন্ত সংরক্ষিত থাকবে। হাদিস ঐতিহাসিক তথ্য হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কিন্তু একে কুরআনের সমকক্ষ বা বিকল্প মনে করা একটি বড় বিচ্যুতি।
আসুন, আমরা কুরআনকে আমাদের জীবনের একমাত্র ‘ম্যানুয়াল’ হিসেবে গ্রহণ করি এবং মানুষের তৈরি করা বিভ্রান্তি থেকে মুক্ত হয়ে প্রকৃত দ্বীনের পথে চলি।
তথ্যসূত্র (Reference): ১. আল-কুরআন: সূরা আল-মায়েদাহ (৩), সূরা আন-নাহল (৮৯), সূরা আল-আন’আম (৩৮, ১১৫)। ২. সহিহ মুসলিম: কিতাবুয যুহদ, হাদিস নং ৭৩২০। ৩. কিতাবুল আমওয়াল – ইমাম আবু উবায়েদ (হাদিস লিখে রাখার নিষেধাজ্ঞা প্রসঙ্গে)। ৪. মাওলানা মুহাম্মদ আসাদ – ‘The Message of the Qur’an’ (কুরআনের পূর্ণাঙ্গতা বিষয়ক ব্যাখ্যা)।
