ভূমিকা:

বাংলাদেশের এই পবিত্র ভূমিতে ইসলামের আগমন কোনো রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম বা জোরপূর্বক বিজয়ের মধ্য দিয়ে হয়নি। বরং, এটি ছিল এক ভালোবাসার বার্তা, এক আধ্যাত্মিক জাগরণ যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অসংখ্য পুণ্যবান অলি-আউলিয়াদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও প্রেমের হাত ধরে এই জনপদে ছড়িয়ে পড়েছে। তারা কেবল ইসলামের বাণী নিয়ে আসেননি, এনেছিলেন মানবতা, সাম্য, সহিষ্ণুতা এবং আধ্যাত্মিকতার এক নতুন দিকদর্শন। এই কারণে বাংলাদেশের আপামর মুসলিম জনতা তাদের অলি-আউলিয়াদের প্রতি এক গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে, সাম্প্রতিককালে ‘আহলে হাদীস’ বা তথাকথিত ‘ওয়াহাবী’ মতবাদের নামে একটি ভিন্ন ধারার ধর্মীয় প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা এই হাজার বছরের ঐতিহ্য এবং মূলধারার ইসলামিক শিক্ষাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। আমার বিশ্বাস, এই নতুন ধারা প্রকৃতপক্ষে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে এবং মুসলিম উম্মাহকে বিভেদের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
অলি-আউলিয়াদের অবিস্মরণীয় অবদান ও তাদের প্রতি সম্মান:

বাংলাদেশের মাটিকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করার পেছনে রয়েছে অগণিত পীর-মাশায়েখ ও অলি-আউলিয়াদের নিরলস প্রচেষ্টা। সুদূর আরব, পারস্য এবং মধ্য এশিয়া থেকে তারা দ্বীনের দাওয়াত নিয়ে এসেছিলেন, হাতে তরবারি নয়, বরং হৃদয়ে ছিল ভালোবাসা, মুখে ছিল আল্লাহর অমোঘ বাণী। শাহজালাল (রহ.), শাহ পরান (রহ.), খান জাহান আলী (রহ.), বায়েজিদ বোস্তামী (রহ.) সহ আরও অসংখ্য অলি-আল্লাহর নাম এই দেশের ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তারা স্থানীয় মানুষের সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার সাথে মিশে গিয়েছিলেন, তাদের ভাষায় কথা বলেছিলেন এবং ইসলামের সৌন্দর্যকে সহজ সরলভাবে তুলে ধরেছিলেন। তাদের জীবনাচার, চারিত্রিক মাধুর্য এবং আধ্যাত্মিক শক্তি মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল। তারা মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ করেছেন, জনসেবামূলক কাজ করেছেন এবং সমাজের অন্যায়-অবিচার দূর করতে সংগ্রাম করেছেন।
অলি-আউলিয়াদের প্রতি সম্মান জানানো কোনো শিরক বা বিদ’আত নয়; বরং এটি রাসূলুল্লাহ (সা.) এর প্রতি ভালোবাসারই একটি সম্প্রসারণ। হাদিসে এসেছে, “যে মানুষকে সম্মান করে না, সে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করে না।” [তিরিমিজি]। আমরা বিশ্বাস করি, যারা আল্লাহর পথে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করেছেন, মানুষের হেদায়েতের জন্য কাজ করেছেন, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের ঈমানেরই অংশ। তাদের মাজার জিয়ারত করা, তাদের রূহানী ফয়েজ কামনা করা, তাদের স্মরণে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা – এগুলো বহু যুগ ধরে চলে আসা ইসলামিক সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা তাদের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা এবং ভালোবাসা প্রকাশের মাধ্যম। এই সম্মান ইসলামের মৌলিক শিক্ষার সাথে কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়, বরং এটি আধ্যাত্মিক সংযোগ ও ঐক্যের প্রতীক।
আহলে হাদীস/ওয়াহাবী মতবাদের আগমন এবং মূল ইসলামের প্রতি হুমকি:
বাংলাদেশে সম্প্রতি ‘আহলে হাদীস’ নাম ধারণ করে একটি নতুন মতবাদের বিস্তার দেখা যাচ্ছে। এটি মূলত ওয়াহাবী মতবাদেরই একটি সম্প্রসারিত রূপ, যার উৎস ১৮ শতকের আরবে। এই মতবাদের অনুসারীরা নিজেদেরকে কেবল ‘হাদীস’ এর অনুসারী দাবি করে এবং ইসলামের ঐতিহ্যবাহী মাযহাব ও সুফি ধারাকে অস্বীকার করে। তারা অলি-আউলিয়াদের সম্মান জানানো, মাজার জিয়ারত, মিলাদ, কিয়াম, ফাতেহা পাঠ ইত্যাদিকে ‘বিদ’আত’ বা ‘শিরক’ আখ্যা দিয়ে আসছে।
আমার মতে, এই ধরনের প্রচারণা কেবল বিভেদই সৃষ্টি করছে না, বরং এটি বাংলাদেশের হাজার বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক কাঠামোকেও আঘাত করছে। তারা এমন এক ‘নতুন হাদীস ভিত্তিক ধর্ম’ প্রচার করছে যা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজ কখনও দেখেনি। তাদের কঠোর এবং অনমনীয় ব্যাখ্যা ইসলামের উদারতা ও সহিষ্ণুতার পরিপন্থী। তারা মুসলিমদের মধ্যে ঐক্য বিনষ্ট করছে এবং ক্ষুদ্র বিষয়ে মতপার্থক্যকে বড় করে দেখিয়ে ফিতনা ছড়াচ্ছে। এই মতবাদ মূলত সুদূর অতীত থেকে চলে আসা শান্তিপূর্ণ ইসলামিক জীবনধারাকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রচারণার ফলে সমাজে অস্থিরতা বাড়ছে এবং সাধারণ মুসলমানরা বিভ্রান্ত হচ্ছে।
কুরআন ও আল্লাহর একক অনুমোদন: ইসলামের মূল ভিত্তি:
ইসলামের মূল ভিত্তি হলো পবিত্র কুরআনুল কারীম এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) এর সুন্নাহ। কুরআন হলো আল্লাহর বাণী, যা সমগ্র মানবজাতির জন্য পথপ্রদর্শক। একজন মুসলমান হিসেবে আমাদের বিশ্বাস, কুরআনকে গভীরভাবে অধ্যয়ন করা এবং তার নির্দেশাবলী মেনে চলা অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে বলেছেন, “আর তোমরা আল্লাহর রজ্জুকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো এবং বিচ্ছিন্ন হয়ো না।” [সূরা আলে ইমরান: ১০৩]।
আমাদের জন্য একমাত্র অনুমোদন ও নিষেধাজ্ঞার উৎস হলেন আল্লাহ তায়ালা। তাঁর এবং তাঁর রাসূলের নির্দেশ ছাড়া অন্য কোনো মানুষের মনগড়া বিধান বা ব্যাখ্যাকে ধর্মের অংশ হিসেবে মেনে নেওয়া ধর্মের অবমাননা। আমরা অলি-আউলিয়াদের সম্মান করি তাদের আল্লাহর প্রতি গভীর ভক্তি এবং রাসূলের সুন্নাহ অনুসরণের কারণে। তাদের দেখানো পথ কুরআন ও সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল বলেই তারা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছিলেন।
কিন্তু যখন কোনো দল নিজেদেরকে একমাত্র সঠিক ব্যাখ্যাদাতা দাবি করে এবং কুরআন ও সুন্নাহর নামে মনগড়া ফতোয়া জারি করে, যা উম্মাহর ঐক্যে ফাটল ধরায়, তখন তা ইসলামের মূল স্পিরিটের পরিপন্থী হয়। আহলে হাদীস বা ওয়াহাবী মতবাদের এই অতি সরলীকৃত ও সংকীর্ণ ব্যাখ্যা ইসলামের বিশালতাকে অস্বীকার করে। তাদের এই মনোভাব মানুষকে কুরআন ও সুন্নাহর সঠিক মর্মার্থ উপলব্ধি করা থেকে বিরত রাখে এবং চরমপন্থার দিকে ধাবিত করে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের ইসলাম এক বিশেষ ঐতিহ্য ও আধ্যাত্মিকতার ধারা বহন করে চলেছে, যা অলি-আউলিয়াদের মাধ্যমে পুষ্ট হয়েছে। এই ধারা শান্তি, সহিষ্ণুতা এবং মানব প্রেমের উপর প্রতিষ্ঠিত। আমাদের উচিত এই মহান ঐতিহ্যকে সসম্মানে রক্ষা করা এবং অলি-আউলিয়াদের প্রতি আমাদের হৃদয়ের গভীরে লালিত শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বজায় রাখা।
একই সাথে, আমাদের সচেতন থাকতে হবে সেইসব মতবাদের বিরুদ্ধে যারা ইসলামের নাম ব্যবহার করে বিভেদ ও সংঘাত সৃষ্টি করে। আহলে হাদীস বা ওয়াহাবী মতবাদ, যা ঐতিহ্যবাহী ইসলামকে চ্যালেঞ্জ করছে, তা মূলত মূল ইসলামকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাচ্ছে। আমাদেরকে কুরআনের নির্দেশাবলী এবং রাসূলের সুন্নাহর উদার ব্যাখ্যা মেনে চলতে হবে এবং আল্লাহর একক অনুমোদন ও নিষেধাজ্ঞার বাইরে কোনো কিছু মেনে নেওয়ার মতো ধর্মের অবমাননা থেকে দূরে থাকতে হবে। উম্মাহর ঐক্য, শান্তি ও আধ্যাত্মিক উন্নতি আমাদের সকলের কাম্য। আসুন, আমরা সকলে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষার আলোয় আলোকিত হই এবং বিভেদমুক্ত এক সমাজ গঠনে অবদান রাখি।
